বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এশিয়াজুড়ে কারখানা কার্যক্রম শক্তিশালী হয়েছে। রফতানি আদেশ বাড়ায় এ অঞ্চলের উৎপাদন খাত চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। গতকাল প্রকাশিত বেসরকারি খাতের বিভিন্ন জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন শুল্কনীতির যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল, এ অঞ্চলের দেশগুলো তা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। এ অঞ্চলের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর অধিকাংশেই গতমাসে কারাখানা উৎপাদন বেড়েছে। খবর রয়টার্স।
চীনের কারখানা কার্যক্রম জানুয়ারিতে গত কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্রকাশিত রেটিংডগ চায়না জেনারেল ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) ডিসেম্বরে ৫০ দশমিক ১ থেকে বেড়ে ৫০ দশমিক ৩ পয়েন্ট হয়েছে। গত বছরের অক্টোবরের পর এটিই দেশটির উৎপাদন খাতের সর্বোচ্চ অবস্থান। এ জরিপে চীনের রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদার ধাক্কা অনেকটাই সামলে নিয়েছে দেশটি। প্রসঙ্গত, পিএমআই সূচক মান ৫০-এর নিচে থাকলে তা কারখানা কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
এর আগে ২০২৫ সালেও রফতানির ওপর ভর করে চীনের অর্থনীতি ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। বেসরকারি জরিপটি মূলত ছোট ও রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তাই এটি সরকারি তথ্যের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রফতানিনির্ভর দেশগুলোয়ও কারখানা কার্যক্রম বেড়েছে। জাপানের এসঅ্যান্ডপি পিএমআই সূচক ডিসেম্বরের ৫০ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৫১ দশমিক ৫ পয়েন্ট হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টের পর এটিই দেশটির উৎপাদন খাতের সর্বোচ্চ অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মতো প্রধান বাজারগুলো থেকে রফতানি আদেশ বাড়ায় এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের অর্থনীতিবিদ অ্যানাবেল ফিডস বলেন, ‘২০২৬ সালের শুরুতেই জাপানের কারখানা কার্যক্রম আবার বৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। দেশটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গত চার বছরের মধ্যে এবারই উৎপাদন ও নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফনের আভাস দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় পর জাপানের শিল্প খাত আবার শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে।
একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার পিএমআই সূচক ডিসেম্বরে ৫০ দশমিক ১ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৫১ দশমিক ২ পয়েন্ট হয়েছে। এটি ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশটির সর্বোচ্চ অবস্থান।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এশিয়া অর্থনীতিবিদ শিভান ট্যান্ডন বলেন, ‘গত কয়েক মাসে এ অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ থেকে রফতানি বেড়েছে। আমাদের ধারণা, এশিয়ার রফতানিনির্ভর কারখানাগুলোর জন্য সামনের দিনগুলোয় প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’
পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য স্থানেও কারখানা কার্যক্রমে অগ্রগতি অব্যাহত আছে। জানুয়ারিতে তাইওয়ানের পিএমআই সূচক বেড়ে ৫১ দশমিক ৭ পয়েন্ট হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় এ সূচক বেড়ে ৫২ দশমিক ৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। এছাড়া মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের কলকারখানাগুলোয়ও জানুয়ারিতে উৎপাদন বেড়েছে। তবে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। দেশটিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা সামান্য বাড়লেও তা ব্যবসায়ীদের মধ্যে খুব বেশি আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারেনি। এমনকি ভারতের কারখানাগুলোয় কর্মসংস্থান বাড়ার ক্ষেত্রেও এটি তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত মাসে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। মার্কিন শুল্ক নিয়ে আতঙ্ক কমে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ বৈশ্বিক চাহিদাকে চাঙ্গা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত জানুয়ারিতে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। মূলত মার্কিন শুল্ক নিয়ে যে দুশ্চিন্তা ছিল, তা কমে আসায় বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ বৈশ্বিক বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি করেছে।
আইএমএফ মনে করছে, এআই প্রযুক্তির এ জোয়ার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক বাজারের এ চাঙ্গা ভাবই এখন এশিয়ার কারখানাগুলোয় রফতানি আদেশ বাড়াতে সাহায্য করছে। সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের প্রথম মাসেই এশিয়ার উৎপাদন খাতের এ অগ্রগতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।